দ্য বেঙ্গল পোস্ট প্রতিবেদন, পশ্চিম মেদিনীপুর, ১২ আগস্ট: যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রথম বর্ষের মেধাবী ছাত্র স্বপ্নদীপ কুণ্ডুর রহস্য-মৃত্যুর ঘটনায় গ্রেফতার করা হলো পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোনা থানার খারুষা গ্রামের বাসিন্দা তথা ওই বিশ্ববিদ্যালয়েরই M.Sc (Mathematics) পাস পড়ুয়া সৌরভ চৌধুরীকে। শুক্রবার দুপুর থেকে তাঁকে আটক করে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করার পর সন্ধ্যা নাগাদ গ্রেফতার করা হয় বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। এদিকে, এই খবর পশ্চিম মেদিনীপুর তথা চন্দ্রকোনা এলাকায় পৌঁছনোর পরই চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে! ধৃত যুবক ঐতিহাসিক মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুল (Midnapore Collegiate School) এবং মেদিনীপুর কলেজের (Midnapore College) প্রাক্তনী ছিলেন বলে জানা গেছে। এও জানা গেছে, মেধাবী পড়ুয়া সৌরভ মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুল থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর, মেদিনীপুর কলেজে (Midnapore College) গণিত বিষয় (B.Sc in Mathematics) নিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। তবে, মাত্র ১ মাস ক্লাস করার পরই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি (Jadavpur University) হয়েছিলেন বলে জানা যায়। সেখান থেকেই স্নাতক (B.Sc in Mathematics) এবং স্নাতকোত্তর (M.Sc in Mathematics) পাস করেছেন। ২০২২ সালে M.Sc পাস করলেও, যাদবপুরের হোস্টেলের দায়িত্বে থাকা সৌরভ-ই স্বপ্নদীপকে হোস্টেলে ‘অতিথি’ (Guest) হিসেবে রাখার ব্যবস্থা করে দেয় বলে স্বপ্নদীপের বাবা রামপ্রসাদ কুন্ডু’র অভিযোগ। বুধবার রাতে (৯ আগস্ট) ছেলের মৃত্যুর পর, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় যাদবপুরের ‘প্রাক্তনী’ সৌরভের বিরুদ্ধেই পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছিলেন তিনি। শুক্রবার সন্ধ্যা নাগাদ সৌরভকে গ্রেফতার করা হয়। ঘটনা ঘিরে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে চাঞ্চল্য।

thebengalpost.net
সৌরভ চৌধুরী (ছবি- ফেসবুক) :

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বুধবার গভীর রাতে (রাত্রি সাড়ে ১১টা নাগাদ) যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মেন হস্টেলের এ-২ ব্লকের নীচ থেকে নগ্ন ও অচৈতন্য অবস্থায় পাওয়া যায় বাংলা বিভাগের স্নাতক প্রথম বর্ষের ছাত্র স্বপ্নদীপ কুণ্ডুকে। বৃহস্পতিবার ভোরে হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। স্বপ্নদীপের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় র‌্যাগিংয়ের অভিযোগ উঠেছে। নদিয়া জেলার বগুলার বাসিন্দা তথা স্বপ্নদীপের বাবা রামপ্রসাদ কুন্ডু’র অভিযোগ, ‘‘ছেলের মৃত্যুর জন্য হস্টেলের সিনিয়ররাই দায়ী। ওরা (সিনিয়ররা) হয়তো ভেবেছে, এই ছেলে (স্বপ্নদীপ) এখান থেকে চলে গেলে সব ফাঁস হয়ে যাবে। ওই জন্য ওকে মেরে ফেলল!’’ কাঁদতে কাঁদতেই রামপ্রসাদ বলেন, ‘‘সারা গায়ে কালশিটে দাগ! খুব মারধর করেছে আমার ছেলেকে ওরা।’’ অসহায় পিতার আক্ষেপ, ‘‘ছেলে বার বার বলছিল, ও ভাল নেই। আমরা কেন গিয়ে নিয়ে এলাম না ওকে? তা হলে হয়তো প্রাণটা বেঁচে যেত! ভেবেছিলাম শুক্রবার একদম ক্লাস শেষ হলেই নিয়ে আসবো। সেই সময়টুকুও দিল না!” কাঁদতে কাঁদতেই তিনি বলেন, “আমি চাই খুনীরা উপযুক্ত শাস্তি পাক। ফাঁসি হোক। যাতে দ্বিতীয় কোনও স্বপ্নদীপের স্বপ্ন ভেঙে না যায়। আর কোনও বাবা যেন এতো আর্তনাদ না করে। ছেলে হারানোর আর্তনাদ কী আমি জানি। আমাদের হিরের টুকরো হারিয়ে গেছে। ওর টিচাররা ফোন করছে, দাদা আমরা খেতে পারছি না। ঘুমোতে পারছিনা। স্বপ্নদীপের মতো ছেলে লাখে একটা হয় না। ও অনেক ক্যুইজ করত। পুরস্কার পেত। প্রবন্ধ রচনায় ওর নাম আছে।”

এদিকে, স্বপ্নদীপের রহস্য-মৃত্যুর ঘটনায় প্রথম গ্রেফতার হওয়া পড়ুয়ার নাম সৌরভ চৌধুরী। পশ্চিম মেদিনীপুরের এই যুবক আবার ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যমণ্ডিত মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুলের প্রাক্তনী। শুক্রবার দুপুরেই তাকে আটক করা হয়। জানা যায়, এফআইআর-এ সৌরভের নাম জানিয়েছিলেন মৃত স্বপ্নদীপ কুণ্ডুর বাবা রমাপ্রসাদ কুণ্ডু। টানা জেরার পর শুক্রবার সন্ধ্যা নাগাদ সৌরভ চৌধুরীকে গ্রেফতার করে যাদবপুর থানার পুলিশ। জানা যায়, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের (গণিত) প্রাক্তন ছাত্র সৌরভ। ২০২২ সালে অঙ্ক নিয়ে এমএসসি পাশ করেছিলেন। পুলিশ সূত্রে খবর, সৌরভের বাড়ি পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোনায়। ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় যাদবপুরের হস্টেল বেআইনীভাবে থাকা প্রাক্তনীদের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলেছিল স্বপ্নদীপের পরিবার। স্বপ্নদীপের বাবার কথায়, তাঁর ছেলে প্রথমে হস্টেলে থাকার সুযোগ পায়নি। সৌরভ-ই হস্টেলে থাকার ব্যবস্থা করে দেয়। সে মেস কমিটির অন্যতম। যাদবপুরের মেন হস্টেলে মনোতোষ নামে এক ছাত্রের রুমে স্বপ্নদীপের থাকার ব্যবস্থা করে সৌরভ-ই। ওই ঘরে স্বপ্নদীপের রুমমেট ছিলেন কল্লোল ঘোষ নামে দ্বিতীয় বর্ষের এক ছাত্র। জানা যায়, বুধবার রাতে মাকে ফোন করে নিজের অসহায়তার কথা জানান স্বপ্নদীপ। মাকে বলেছিলেন, “খুব ভয় করছে”। মাকে খুব তাড়াতাড়ি তাঁর কাছে যেতে বলেছিলেন। পরের দিন বাবার সঙ্গে বাড়ি ফেরার কথাও জানিয়েছিলেন। কিন্তু, তার আগেই সব শেষ! খুনিদের ফাঁসি চাইছেন স্বপ্নদীপের বাবা-মা।

thebengalpost.net
স্বপ্নদীপ কুন্ডু :

স্বপ্নদীপের বাবা রামপ্রসাদ কুন্ডু’র অভিযোগ, “ছেলে বিজ্ঞান বিষয় নিয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করলেও, বাংলা নিয়ে পড়তে চেয়েছিল। বলেছিল যাদবপুরে পড়লে স্যারদের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখতে পারব। হোস্টেলে গিয়েই কালপ্রিটদের সঙ্গে দেখা হল! সৌরভ মাদকাসক্ত। র‌্যাগিংয়ের নামে বাচ্চাগুলোকে নিয়ে নয়ছয় করে। আমার ছেলেটার মৃতদেহ ওরা উলঙ্গ করে ছুঁড়ে ফেলেছে। মেরে খুন করে উলঙ্গ করে ফেলেছে। ১৫-২০ মিনিট ওখানে পড়েছিল। ওখানেই বোধহয় মারা যায়। পরে কেউ হাসপাতালে গিয়ে ভর্তি করে। এদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। শিক্ষা লাভ করতে গিয়ে কেউ যেন এভাবে কফিনবন্দি হয়ে না আসে।” এদিকে, সৌরভের গ্রেফতারির পর মাথায় হাত আপামর পশ্চিম মেদিনীপুরবাসীর। ত্যাগ, তিতিক্ষা, শান্তি, সম্প্রীতি, শিক্ষা ও সংস্কৃতির জেলা হিসেবেই বিখ্যাত শহিদ ক্ষুদিরাম আর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মেদনীপুর (অধুনা, পশ্চিম মেদিনীপুর)। সেই জেলার কোন এক মেধাবী পড়ুয়া যে এভাবে অপর এক মেধাবী পড়ুয়ার ‘স্বপ্ন-দীপ’ নিভিয়ে দেবে, তা যেন বিশ্বাসই করতে পারছেন না আপামর মেদিনীপুরবাসী!

thebengalpost.net
সন্তানহারা অসহায় বাবা-মা :

অন্যদিকে, শনিবার (১২ আগস্ট) সকালে সৌরভের চন্দ্রকোনার বাড়িতে সাংবাদিকরা পৌঁছলে তার বাবা নিরূপ চৌধুরী ও মা প্রণতি চৌধুরী জানান, “সৌরভকে ফাঁসানো হয়েছে। আমার ছেলে অনেকদিন ধরে ওখানে আছে। কখনো সে এই কাজ করতে পারে না। ওকে ছেলেমেয়েরা খুব ভালোবাসতো। ও খুব ভালো বলেই, ওখানে থাকতে দেওয়া হয়েছিল। আমরা খুব গরিব বলে, ওখানে থেকে কম্পিটিটিভ পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।” তাঁদের সংযোজন, “ওর একটাই দোষ। ও ওই ছেলেটির বাবা-কে বলেছিল, হ্যাঁ কাকু আমি লক্ষ্য রাখবো। এখন ওকেই ফাঁসানো হচ্ছে।” তবে, বাবা নিরূপ চৌধুরী কাঁদতে কাঁদতে এও বলেন, “যদি আমার ছেলে সত্যিই দোষী হয়, ও শাস্তি পাক। তবে, সঠিক তদন্ত হোক।” ইতিমধ্যে, তাঁরা কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন। এলাকাবাসীরা জানান, “সৌরভকে মেধাবী প্রকৃতির ও খুব ভালো ছেলে বলেই আমরা জানি। কিভাবে ও এই চক্রে ফেঁসে গেল, বুঝতে পারছি না!” সকলেই চাইছেন ঘটনার যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা হোক। আর, প্রকৃত দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক।