দ্য বেঙ্গল পোস্ট বিশেষ প্রতিবেদন, সমীরণ ঘোষ, ১৮ আগস্ট: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘জীবিত ও মৃত’ ছোটগল্পের কাদম্বিনী “মরিয়া” প্রমাণ করেছিল যে, “সে মরে নাই”! তৃণমূল রাজ্য নেতৃত্বের তরফে ঘোষিত ঘাটাল সাংগঠনিক জেলার “মহিলা সভাপতি” মনোনীত হয়ে কাবেরী চ্যাটার্জি (Kaveri Chatterjee) ও যেন প্রমাণ করলেন, তিনি গত ১৯ শে ডিসেম্বর (২০২০) শুভেন্দু অধিকারী’র হাত ধরে শাহি সভায় (অমিত শাহের সভায়) বিজেপি-তে “যোগ দেন নাই”! যদিও, ঘোষণা’র প্রায় ২৪ ঘন্টা পরেও পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা জুড়ে “কাবেরী ধোঁয়াশা” বিদ্যমান! এখনও ধোঁয়াশা ভেদ করতে পারছেন না, ঘাটাল জেলা তৃণমূলের নেতৃত্বরাও। শুধু ঘাটাল কেন, মেদিনীপুর সাংগঠনিক জেলার নেতৃত্বরাও মাথা চুলকাচ্ছেন ‘বেঙ্গল পোস্ট‘ সহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের উত্তরে। এই কাবেরী, ‘কোন কাবেরী’? স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না কারুর কাছেই! প্রশ্ন অনেক। ১৬ ই আগস্ট (সোমবার) ঘোষিত সাংগঠনিক রদবদল অনুযায়ী, পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা তৃণমূলের সংগঠন-কে লোকসভার ভিত্তিতে দু’টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে- মেদিনীপুর ও ঘাটাল। মেদিনীপুর সাংগঠনিক জেলার মধ্যে আছে, ৮ টি বিধানসভা কেন্দ্র, যথাক্রমে- মেদিনীপুর, খড়্গপুর সদর, খড়্গপুর গ্রামীণ, নারায়ণগড়, দাঁতন, কেশিয়াড়ি, গড়বেতা ও শালবনী। অপরদিকে, ঘাটাল সাংগঠনিক জেলার মধ্যে আছে- ঘাটাল, দাসপুর, কেশপুর, চন্দ্রকোনা, ডেবরা, সবং ও পিংলা এই ৭ টি বিধানসভা কেন্দ্র। ঘাটাল জেলা তৃণমূলের সভাপতি মনোনীত হওয়া কাবেরী চ্যাটার্জি (পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা পরিষদের উপাধ্যক্ষ) গোয়ালতোড়ের (গড়বেতা- ২ নং ব্লক) বাসিন্দা এবং এই এলাকার বিজয়ী জেলা পরিষদ সদস্যা। গোয়ালতোড় (গড়বেতা ২ নং ব্লকের অন্তর্গত) এলাকার বেশিরভাগ অংশ শালবনী বিধানসভা অর্থাৎ মেদিনীপুর সাংগঠনিক জেলার অন্তর্ভুক্ত। অপরদিকে, শুধু শালবনী নয়, গড়বেতা বিধানসভা-টিও নবগঠিত মেদিনীপুর সাংগঠনিক জেলার অন্তর্গত। সেই সূত্রে, তৃণমূল কর্মী সমর্থকদের প্রথম প্রশ্ন, মেদিনীপুর সাংগঠনিক জেলার গোয়ালতোড়ের বাসিন্দা কাবেরী চ্যাটার্জি কিভাবে ঘাটাল সাংগঠনিক জেলার বড়সড় দায়িত্ব পেলেন? দ্বিতীয় প্রশ্ন, কাবেরী চ্যাটার্জি “মনেপ্রাণে” যাননি হয়তো, তবে শাহি সভায় তাঁর বিজেপি-তে যোগদান কি তিনি নিজেও অস্বীকার করতে পারবেন? তৃতীয় ও সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, বিজেপি-তে তিনি গিয়েছিলেন ঠিক আছে, কিন্তু ফিরলেন কবে? এছাড়াও যে প্রশ্নগুলি উঠছে, গোটা ঘাটাল সাংগঠনিক জেলায় একাধিক মহিলা নেত্রী থাকা সত্ত্বেও, কেন একসময়ের ঘোষিত “দাদার অনুগামী” (শুভেন্দু অনুগামী) এবং বিজেপি-তে যাওয়া (সাময়িক সময়ের জন্য হলেও), মেদিনীপুর সাংগঠনিক জেলার নেত্রীকেই ঘাটালের মহিলা সংগঠনের শীর্ষ পদে বসানো হল?

thebengalpost.in
মেদিনীপুরের সেই শাহি সভায় মঞ্চের উপরে দাদার অনুগামীরা :

thebengalpost.in
একেবারে ডানদিকে কাবেরী চ্যাটার্জি (১৯ ডিসেম্বর, ২০২০) :

উত্তর দেওয়ার লোক নেই! সঠিক উত্তর দেওয়া তো দূরের কথা, বরং সোমবার (১৬ আগস্ট) সন্ধ্যা থেকে মঙ্গলবার রাত অবধি দুই সাংগঠনিক জেলার নেতা-কর্মীরা নিজেরাই বিভ্রান্ত হয়ে থাকলেন। অনেকেই অবশ্য বললেন, বুধবার বিষয়টা পরিষ্কার হবে! আবার, অনেকে রীতিমতো তর্ক করে গেলেন, “এই কাবেরী সেই কাবেরী নয়! উনি তো মেদিনীপুর সাংগঠনিক জেলার, ঘাটালে অন্য কাবেরী আছে”। কিন্তু, কোন কাবেরী? দ্বিতীয় কাউকে পাওয়া গেলনা মঙ্গলবার রাত অবধি। অনেকেই যুক্তি সাজালেন, “আরে উনি বিজেপি থেকে ফিরে তৃণমূলে এখনও যোগদান (জয়েন)-ই করেননি, তাই নিশ্চিত এই কাবেরী, সেই কাবেরী নয়।” এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দিলেন একজনই। তিনি কাবেরী চ্যাটার্জি স্বয়ং। সংবাদমাধ্যম-কে স্পষ্ট জানিয়েছেন, “আমি তো তৃণমূল ছাড়িনি। তাহলে নতুন করে দলে অন্তর্ভুক্তির প্রশ্ন কেন! তাছাড়া আমি কয়েকদিন আগে জেলা পরিষদের কর্মাধ্যক্ষ নির্বাচনের স্থায়ী সমিতি গঠনের সভাতেও ছিলাম।” তবে, বিজেপি-তে যোগদান? “সেই অর্থে যোগদানই করিনি। তবে, বর্তমান বিরোধী দলনেতা তথা আমাদের দলের প্রাক্তন পরিবহন মন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী মেদিনীপুরের যে সভা থেকে বিজেপিতে যোগদান করেছেন, সেখানে উপস্থিত ছিলামনা এটাতো অস্বীকার করতে পারবনা! কিন্তু, একদিনের জন্যও বিজেপি করিনি। বিধানসভা নির্বাচনেও তৃণমূলের হয়েই প্রচার চালিয়ে গেছি। এটা দলীয় নেতৃত্ব জানেন।” কিন্তু, তিনি তো মেদিনীপুর সাংগঠনিক জেলার বাসিন্দা? এই বিষয়ে অবশ্য তিনি দলীয় নেতৃত্বের ঘাড়েই দায়িত্ব চাপিয়েছেন! অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন, তিনি কি ‘নিশ্চিত’ যে তাঁকেই ঘাটাল মহিলা সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে? পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা পরিষদের উপাধ্যক্ষা কাবেরী চ্যাটার্জি জানিয়েছেন, তাঁর সাথে রাজ্য নেতৃত্বের কথা হয়েছে এবং তাঁকে এই খবর দেওয়া হয়েছে। এই বিষয়ে ঘাটাল জেলা তৃণমূলের নব নির্বাচিত সভাপতি আশিস হুদাইত থেকে শুরু করে কেউই কোনও মন্তব্য করতে চাননি মঙ্গলবার পর্যন্ত। মুখে কুলুপ এঁটেছেন, বিজেপি-তে থাকা অন্যান্য “দাদার অনুগামী”রা। তবে, রাজনৈতিক সমালোচকদের অনেকেই বলছেন, ডানপন্থী দলে বিশেষ ছুঁৎমার্গ নেই! আর, পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা তৃণমূলে এর আগেও এরকম ঘটনা ঘটেছে বলে অনেকের দাবি। একসময়ের অভিজ্ঞ কংগ্রেস নেতা তথা জেলার সেই সময়ের দাপুটে শিক্ষক নেতা কেশপুরের তপন চক্রবর্তী তৃণমূলে যোগ দেওয়ার আগেই তাঁকে কেশপুরের ব্লক সভাপতি করা হয়েছিল। শুধু কংগ্রেস বা তৃণমূল নয়, রাজ্যের বিরোধী দল বিজেপি-ও বিধানসভা নির্বাচনের প্রার্থী ঘোষণা করতে গিয়ে এই ধরনের কাণ্ড ঘটিয়েছে! সোমেন পত্নী শিখা মিত্র বিজেপি-তে যোগ না দিলেও, তাঁর নাম চৌরঙ্গী বিধানসভার প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করে বিজেপি’র শীর্ষ নেতৃত্ব। পরে, শিখা’র অনড় মনোভাবের কাছে নতিস্বীকার করে বিজেপি ফের ওই বিধানসভা আসনে অন্য প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে।

thebengalpost.in
মেদিনীপুরের সেই শাহি সভা :