দ্য বেঙ্গল পোস্ট প্রতিবেদন, পশ্চিম মেদিনীপুর, ১৬ ফেব্রুয়ারি: মেদিনীপুর শহরের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাগৃহ ‘বিদ্যাসাগর স্মৃতি মন্দির’ (বিদ্যাসাগর হল)-এর সংস্কার ও আধুনিকীকরণের জন্য ৮০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দ্রুত সেই কাজ শুরু হবে বলে জানিয়েছেন মেদিনীপুরের বিধায়ক সুজয় হাজরা। স্বাভাবিকভাবেই উচ্ছ্বসিত মেদিনীপুরবাসী। তাঁরা মনে করিয়ে দেন, ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের ১৬ ডিসেম্বর এই প্রেক্ষাগৃহের (১৩৪৬ বঙ্গাব্দের ৩০ অগ্রহায়ণ) দ্বারোদঘাটন করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তার একবছর আগে (১৯৩৮-এর ১০ সেপ্টেম্বর) এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণের হাত ধরে।


শহরবাসীর গর্বের সেই ‘বিদ্যাসাগর স্মৃতি মন্দির’ (বিদ্যাসাগর হল)-এরই এখন জরাজীর্ণ ও ভগ্নপ্রায় দশা। কোথাও দেওয়ালে ফাটল। কোথাও আবার ছাদ চুঁইয়ে পড়ে জল। ভাঙাচোরা সিঁড়ি। প্রায় অচল সাউন্ড সিস্টেম। পুরানো দিনের চেয়ার ও পাখা। দীর্ঘদিন ধরেই শহরের সচেতন ও সংস্কৃতিমনস্ক মানুষজন এবং বিভিন্ন সংগঠনগুলি ঐতিহ্যমন্ডিত এই প্রেক্ষাগৃহের সংস্কার ও আধুনিকীকরণের দাবি তুলে আসছিলেন। বেশ কয়েকমাস আগে মেদিনীপুরের বর্তমান বিধায়ক সুজয় হাজরা তৎপর হয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন শহরবাসীর এই আবেদন। আর তাতেই এবার সাড়া দিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। বিদ্যাসাগর হল (বিদ্যাসাগর স্মৃতি মন্দির) সংস্কার ও আধুনিকীকরণের জন্য ৮০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করলেন মুখ্যমন্ত্রী। গত সপ্তাহেই সেই সংক্রান্ত কাগজপত্র তাঁর কাছে এসে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন মেদিনীপুরের বিধায়ক সুজয়। তিনি এও জানিয়েছেন, ‘মেদিনীপুর শহরের বিদ্যাসাগর স্মৃতি মন্দিরের জন্য ৮০ লক্ষ টাকা অনুমোদন করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। এই অর্থে, প্রেক্ষাগৃহের আধুনিকীকরণের কাজ সম্পন্ন হবে। শীততাপ নিয়ন্ত্রিত হবে এই প্রেক্ষাগৃহ। সাউন্ড সিস্টেম উন্নত করা হবে। বদলে দেওয়া হবে সমস্ত চেয়ার। সেই সঙ্গেই প্রেক্ষাগৃহের বাইরের ও ভিতরের দেওয়াল জুড়ে অখন্ড মেদিনীপুরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য ফুটিয়ে তোলা হবে। স্বাধীনতা সংগ্রামের ‘আঁতুড়ঘর’ মেদিনীপুরের বীর বিপ্লবীদের ছবি ও সংক্ষিপ্ত জীবনকাহিনীও চিত্রিত করা হবে।’


বিদ্যাসাগর স্মৃতি মন্দিরের গর্বের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দিয়ে, লেখক ও গবেষক অমিতকুমার সাহু, অরিন্দম ভৌমিক প্রমুখ বলেন, ‘১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের ১৫ ডিসেম্বর, শুক্রবার রাত্রি ১০টা নাগাদ স্পেশাল ট্রেনে করে মেদিনীপুর স্টেশনে এসে পৌঁছেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকার, অধ্যাপক ও লেখক ক্ষিতিমোহন সেন, সাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, কবি অমিয় চক্রবর্তী, পত্রিকা সম্পাদক সজনীকান্ত দাস, রামচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ। স্টেশনে লাল শালু পাতা ছিল। রামগড়ের রাজবাড়ি (বর্তমানে, কৈবল্যদায়িনী কলেজ অফ কমার্স)-তে রাত কাটিয়েছিলেন তাঁরা। পরদিন সকাল ১০টায় দ্বারোদঘাটন করেন রবীন্দ্রনাথ। দশ হাজার নর-নারী শঙ্খ ও উলুধ্বনির মধ্য দিয়ে রবি ঠাকুরকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। তাঁর ব্যবহৃত চেয়ার ও টেবিল এখনও সংরক্ষিত আছে, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের মেদিনীপুর শাখার কক্ষটিতে।’ পরবর্তী সময়ে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, সত্যেন্দ্রনাথ বসুর মতো অসংখ্য বরেণ্য ব্যক্তিত্বরা এই বিদ্যাসাগর স্মৃতি মন্দিরে এসেছিলেন বলে জানান তাঁরা। মেদিনীপুরের সমাজকর্মী সুদীপকুমার খাঁড়া, মৃত্যুঞ্জয় সামন্ত প্রমুখ বলেন, ‘এমন একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাগৃহের সংস্কারের জন্য মুখ্যমন্ত্রী অর্থ বরাদ্দ করায় অমরা সত্যিই ধন্য।’ জেলার বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অখিলবন্ধু মহাপাত্র, শুভদীপ বসু, রত্না দে, রীতা বেরা প্রমুখ বলেন, ‘সুপ্রাচীন ও ঐতিহাসিক এই শহরে জেলা পরিষদের প্রদ্যোৎ স্মৃতি সদন ছাড়া আর একটিও আধুনিক ও শীততাপ নিয়ন্ত্রিত প্রেক্ষাগৃহ নেই। প্রদ্যোৎ স্মৃতি সদনের ভাড়াও অনেকটাই বেশি। বিদ্যাসাগর হল সংস্কারের খুব প্রয়োজন ছিল। বিধায়কের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই।’ বিধায়ক সুজয় বলেন, ‘মেদিনীপুর শহরের বিদ্যাসাগর স্মৃতি মন্দির ছাড়াও, মেদিনীপুর গ্রামীণের কঙ্কাবতী কমিউনিটি হল আধুনিকীকরণের জন্যও ১০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। এছাড়াও, শালবনির বাঘমারিতে ২০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে গড়ে উঠবে নতুন একটি এস-এসটি কমিউনিটি হল।’












